কান্নারও কেউ নেই শহীদ লতিফের


 আবদুল লতিফ। ১৯৭৮ সালে সিরাজগঞ্জ শহরের গয়লা এলাকায় তার জন্ম। লতিফ যখন তার মা বেদেনা খাতুনের গর্ভে ছিলেন, তখনই তার ভাগ্যে নেমে আসে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। বাবা আসু মুন্সি বেদেনাকে তালাক দেন। ফলে আশ্রয়ের অভাবে বেদেনা চলে আসেন সিরাজগঞ্জের গয়লা এলাকায় বোন নুরজাহানের কাছে। সেখানেই জন্ম হয় লতিফের।

শৈশব থেকেই লতিফের জীবন কষ্টের ছিল। আর এতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। মা বেদেনা মানুষের বাড়িতে কাজ করে তাকে বড় করেন। কিন্তু একসময় তিনিও চলে যান না ফেরার দেশে, রেখে যান এক নিঃসঙ্গ এতিম লতিফকে। খালার সংসারে আশ্রিত লতিফ বড় হলেও নিজের বলতে কিছু ছিল না। না কোনো সম্পদ, না কোনো নিরাপত্তা।

তরুণ বয়সে লতিফ খেটেখাওয়া মানুষের কাতারে নিজেকে দাঁড় করান। কখনো দিনমজুরি, কখনো রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু খালাও মৃত্যুবরণ করলে লতিফ পুরোপুরি একা হয়ে যান। নিঃসঙ্গ জীবনে নিয়মিত কোনো রোজগার ছিল না, বিয়েও করেননি। তার পাশে দাঁড়ানোর কেউ ছিল না। ছিল না কোনো সামাজিক স্বীকৃতিও।

এমন এক অবস্থার মধ্য দিয়ে বড় হয়েও দেশ ও জাতির জন্য কিছু একটা করার স্বপ্ন ছিল লতিফের। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকার রাজপথে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশ নেন। আন্দোলন যখন থেকে দানা বাঁধে, তখন থেকেই মাঠে সরব উপস্থিতি ছিল লতিফের।

৪ আগস্ট যখন আন্দোলন চরমে পৌঁছায়, তখন শত শত তরুণ আর নানা পেশার মানুষ চূড়ান্ত মিছিল নিয়ে সিরাজগঞ্জ শহরের প্রধান সড়ক এসএস রোডের দিকে এগিয়ে যায়। ফ্যাসিস্ট হাসিনার অনুগত যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা মিছিলে গুলি চালায়। এ সময় একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় লতিফের শরীরে। কালো পিচঢালা পথ রঞ্জিত হয় তার উষ্ণ রক্তে। অতঃপর রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে শেষ হয়ে যায় লতিফের নিঃসঙ্গ জীবনের সব লড়াই। তার নিথর দেহ পড়ে থাকে রক্তস্নাত মাটিতে আর দীপ্ত জীবন কেড়ে নিল এক নিষ্ঠুর স্বৈরতন্ত্র।

লতিফের লাশ গ্রহণ করেন স্বামীপরিত্যক্তা, সহায়-সম্বলহীন খালাত বোন সালেহা খাতুন। স্বজন আর অভিভাবকহীন এক মানুষের লাশের জন্য আর কেউ এগিয়ে এলো না।

কিন্তু লতিফের রক্ত বৃথা যায়নি। তার আত্মত্যাগ এক অন্যায়ের শাসনব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।

জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশকে মুক্ত করল এক কলঙ্কময় ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে। খুলল সম্ভাবনাময় এক নতুন ভবিষ্যতের দ্বার। এই মুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের জন্য কত জীবন গেল। কত মানুষ আহত হলো। পঙ্গুত্ববরণ করল অনেকেই। কারো চোখের আলো চিরতরে নিভে গেছে। কত স্বজনহারা মানুষের কান্না দেখেছে বাংলাদেশ। তবে সবহারা লতিফের জন্য কান্নার কেউ ছিল না। এই পৃথিবীর কোথাও তার কাছের কেউ নেই।

Comments

Popular posts from this blog

হে‌লিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে শহীদ হন রা‌কি‌বু‌ল

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ জুয়েলের বাবা-মা

একমাত্র উপার্জনকারী সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা পরিবার