শনির আখড়া থেকে যাত্রাবাড়ী
১৯ জুলাই ২০২৪শনির আখড়া থেকে যাত্রাবাড়ী অভিমুখ, বিকেল ৫টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী অন্যান্য আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিয়ে শনির আখড় ফুটওভার ব্রিজের নিচে অবস্থান নিয়েছেন। আশেপাশের কাউকেই চেনেন না তিনি, এখানে আন্দোলনে এসে কয়েক ঘণ্টা আগে দেখা হয়েছে সবার সাথে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া থেকে শুরু করে টোকাই, সবাই এখানে আছে। অন্তত কয়েক শত মিটার দূরে অসংখ্য পুলিশ। তারা গুলি ছুড়ছে কিন্তু ধীরে ধীরে যাত্রাবাড়ীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ছাত্র-জনতা। পরিস্থিতি পনেরো মিনিট ধরে শান্ত। কোন গুলি ছোড়া বা সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ হচ্ছে না। ছাত্রদের পক্ষ থেকেও কোন ইট-পাটকেল নিক্ষেপ হচ্ছে না। স্লোগান চললেও এখন ক্লান্ত। সবাই দাঁড়িয়ে উৎকণ্ঠায় সময় পার করছে। কিন্তু হুট করেই পাশের একজনকে লুটিয়ে পড়তে দেখে চমকে গেল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কয়েক মুহুর্ত কেউই কিছু বুঝল না। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই ভয় ছড়িয়ে পড়ল। ছেলেটির শরীরে বড় কোন গুলির চিহ্ন নেই কিন্তু ঘাড় থেকে রক্ত পড়ছে। ভয়ে পেছনে দৌঁড় দিল সবাই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বুঝতে পারল কোন একটা খটকা আছে। এতগুলো মানুষকে ভেদ করে পুলিশের গুলি তার পাশের জনের গায়ে লাগার কথা না। গুলির নূন্যতম কোন শব্দ হয়নি। সাইলেন্সার লাগানো বন্দুক দিয়ে এতদূরে এত মানুষকে ভেদ করে নিশ্চয়ই সায়েন্স ফিকশন ফিল্মের মতো গুলি করা সম্ভব না। ঠিক তখনই একটা গালি, শুয়রের বাচ্চা ছাদ থেকে গুলি করোস? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সম্বিত ফিরতেই দেখতে পায়, তার মতো অনেকেই একটি ছাদের দিকে নির্দেশ করছে। সেখানে অবশ্য এখন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সম্ভবত ছাদ থেকে গুলি করা হয়েছে। কিন্তু এটা তো থানা বা পুলিশের আওতাধীন কোন জায়গা নেই। একটা নেহায়েত ভাড়া বাড়ি। এটার ভেতরে ঢুকতে হলে তাদেরকে পার করেই ঢুকতে হবে। কিন্তু সকাল থেকেই যা অবস্থা, কেউই বাড়িতে ঢুকেনি। তার মানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল? আরও ভয়ঙ্কর বিষয় বাকি আছে। তার মানে কি স্নাইপার দিয়ে গুলি করা হচ্ছে? মুহুর্তেই ভয় ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। অনেকেই ঢুকে গেল আশেপাশের গলিতে। ছত্রভঙ্গ হতে দেখে পুলিশ অনেকটা সক্রিয় হয়ে উঠল। এক দুইটা সাউন্ড গ্রেনেড মেরে ক্লিয়ার করতে চাইলো জায়গাটা। অতি উৎসাহী কসাই প্রকৃতির কোন কনস্টেবল হয়তো গুলিও ছুড়ল, লুটিয়েও পড়ল কয়েকজন। এই মৃত্যুগুলো কেমন যেন অভ্যস্ত লাগছিল সবার কাছে, কারণ ১৯ জুলাই সারাদিনজুড়ে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল সরকার। কিন্তু কে যেন লাঠি নিয়ে দৌঁড়ে গেল সেই বাড়িটির দিকে, যেই বাড়ির ছাদে কেউ একজন লুকিয়ে আছে। যে কিনা স্নাইপারের মতো ভয়ঙ্কর অস্ত্র নিয়ে গুলি করছে ছাত্র-জনতার উপর। একটা লাঠি দিয়ে স্নাইপারের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে কেন যেন শত শত ছাত্ররা দৌঁড় দিল বাড়িটির দিকে। স্নাইপিং করা কাপুরুষ হয়তো জানে না, ভয় এবং সাহস -দুটোই বড্ড সংক্রামক।

Comments
Post a Comment